অ-এ অর্বাচীন

আমি একটি পাঠাগারে যাই প্রতি রোববার। আসলে কি জানি ছোটবেলা থেকেই পাঠাগার ব্যবহার করে পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। কিশোর জীবনে পয়সা দিয়ে বই কিনতে পারার অক্ষমতাও অন্যতম কারণ ছিল। দিল্লীর বুকে বাংলা বইয়ের পাঠাগারগুলো বইয়ে ঠাসা হলেও পাঠকের অভাবে ধুঁকছে। তাই সে পাঠাগারে যে চার পাঁচটি পাঠক আছেন তার মধ্যে এই অধমও আছে।

রোববার সকাল। গিয়ে দেখি সব পাঠকই উপস্থিত। নরক গুলজার। চায়ের কাপে টাইফুন। পেট থেকে পড়েই আড্ডাবাজ। বসে পড়লাম জমিয়ে। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক টাইপ করা কাগজ থেকে নিজের ইংরেজিতে লেখা রম্য রচনা শোনাচ্ছেন। আমি ইংরেজি সিনেমা দেখে তার ডায়লগ থেকে ‘ইয়া’ শব্দটি ছাড়া জীবনে এযাবৎ অন্য শব্দের একবর্ণও বুঝতে পারিনি। তাই বললাম ‘একটু পড়ে দেখি?’।

তিনি কাগজটি পকেটস্থ করে বললেন,’ছাপা না হওয়া পর্যন্ত আমি নিজের লেখা কাউকে দেখাই না।

পাশ থেকে বন্ধু আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘দাদা, এও একটু আধটু লেখা টেখা…’।

অধ্যাপক আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কোন কোন পত্রিকায় লেখেন?’ আমি জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলি, ‘ওই… ওয়েব ম্যাগ অবধি দৌড় আর কি… ছাপা পত্রিকাতেও দু একটা…’।

আমার মুখের কথা না ফুরতেই ওনার মুখে ফুটল, ‘অ, তো সে ওয়েব ম্যাগটি কি জিনিস?’

বললাম। শুনে বললেন, ‘অ’।

আবার প্রশ্ন করেন, ‘গল্প না প্রবন্ধ?’

বলি, ‘গল্প, প্রবন্ধ, যখন যেটা মনে আসে…’।

জ্ঞানী বৃদ্ধটি বললেন, ‘অ’।

পাশ থেকে আর এক পাঠক, ‘দাদা, ও বাঙলায় লেখে…’।

উনি হতাশ হয়ে, ‘অ, বাঙলা!’

তারপর আবার প্রশ্ন, ‘ওই ম্যাগ না কি বললেন, ওগুলো কেউ পড়ে?’

আমি অজ্ঞানী। বলে বসি, ‘জানিনা, আমি তো পড়ি, অন্য কেউ…’।

আবার উত্তর এলো, ‘অ’।

এতদিন অ-এ অজগর জানতাম। আজ বুঝলাম, অ-এ অর্বাচীন। কারণ অ-এ অরূপও।

একটা বাঙলা বই কাঁধের ঝোলায় সম্বল করে, আমি অর্বাচীন, ডেরায় ফিরলাম।