বাঙালির বাংরেজি

বাংলায় ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তন হয়েছিল বলেই বোধহয় ইংরেজি ভাষার প্রতি বাঙালির একটু দুর্বলতা আছে। কিন্তু সেই দুর্বলতা, তাকে কখন যে দুর্বল করে দেয়, সে নিজেও জানে না। তবু কথার মাঝে দুচারটে ইংরেজি বুলি গুঁজে দিতে না পারলে, নিজেকে কেমন যেন সাধারণ মাপের বলে মনে হয়। শিক্ষিত বাঙালির মুখের ভাষা তাই ইংরেজি। বাংরেজির বানে ভেসে যেতে যেতে টেরই পাওয়া যায় না, কখন সব উজাড় হয়ে গেছে।

জীবনের প্রথম চাকরিটি পাই এক সওদাগরি অফিসে। আমার বসটি ছিলেন দখিনি। তিনি তখন সদ্য কোলকাতায় ট্রান্সফার পেয়ে এসেছেন। বাংলা শব্দের মধ্যে ‘ভালো’ ছাড়া অন্য শব্দ বলতে শিখে উঠতে পারেননি। সেই ‘ভাল’ শব্দটা আবার অনেকটা শোনাত – ‘বালো’। কাজেই প্রথম দিন, প্রথম দর্শন থেকেই, ‘মে আই কাম ইন’ দিয়ে শুরু হল চাকুরি জীবন। মনে মনে বাংলা বাক্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে টেবিলের অপর প্রান্তে ছুঁড়ে দিতে থাকলাম। আমাকে থামিয়ে দিয়ে, মাঝে মাঝে তিনি বলে ওঠেন, “হোয়াট?”, “রিপিট”, “পার্ডন”, ইত্যাদি। সীমিত গুটিকতক ইংরেজি শব্দ সম্বল করে, সকাল বিকেল তাকে মনে মনে প্রচুর গালাগালি করে, ‘পার্ডন’ করা আর হয়ে উঠল না। বুঝলাম মফস্বলের বাংলা মিডিয়াম ইশকুলে আর যাই হোক, মুখে মুখে ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ করা শিখে ওঠা যায়নি, আর হলেও অপরপক্ষকে বোঝাতে ঘাম ছোটে।

কিছুদিন পর একটু ভরসা হল, যখন আমাদের অফিসের একাউন্টেন্টকে সাহেবকে চেম্বারে বসে টেলিফোনে শুধু মাত্র “নো নো নো নো নো নো…ইয়েস ইয়েস ইয়েস ইয়েস…” দিয়ে কাজ চালাতে দেখলাম।

চৌরঙ্গী সিনেমার কথা মনেপড়ে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। উত্তমকুমার, স্যাটা বোস শুভেন্দুকে বলছেন – যখন হোটেলে চাকরি করতে এসেছিলাম, তখন হোটেলওয়ালারা সেক্সপিয়ারের মত ইংরেজি, রবীন্দ্রনাথের মত বাংলা, আর তুলসী দাসের মত হিন্দি তার কাছে আশা করেছিল। কিন্তু আমি সেক্সপিয়ারের মত বাংলা, রবীন্দ্রনাথের মত হিন্দি, আর তুলসীদাসের মত ইংরেজি দিয়ে কাজ চালাতে লাগলাম।

তাই নিজের তুলসীদাস তুল্য ইংরেজি মুনশিয়ানা নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে লাগলাম।

বছর দুয়েক সওদাগরি অফিসে কাজ করে চললাম দিল্লির মসনদে। তখন সরকারি মসনদ ছিল লৌহ নির্মিত প্লাস্টিকের বেতের চেয়ার, ঘূর্ণায়মান চক্রবাহিত কুশনাবৃত চেয়ার তখনো চালু হয়নি। দ্বিতীয়োক্ত চেয়ারে বসা মাত্র ইংরেজির বানভাসি হতে দেখেছি চাকরির পরবর্তী পর্যায়ে। প্রথমোক্ত চেয়ারে বসে ইংরেজিতে কথা বলা আয়ত্ব করা বেশ কষ্টকর হল। সে যাই হোক কাজ চলতেই থাকল। বাংলার বেশ কিছু বাঘ ও বাঘিনী তখন দিল্লিতে রাজনীতির শক্তি-অলিন্দে দাপট করে বেড়াচ্ছিল। কোনও এক সভায় এমনই এক বাংলার বাঘিনীকে (তিনি তখন কংগ্রেসর খেল মন্ত্রী) দেখলাম হিন্দি-ইংরেজি-বাংলার খিচুড়ি বানিয়ে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে পরিবেষণ করছেন। আবার ভরসা হল নিজের উপর। ছোটবেলায় পড়া গল্প মনে পড়ে গেল। এক কেরানী ইংরেজ ঊর্ধ্বতনকে উদ্দেশ্য করে বেতন বাড়ানোর দরখাস্তে ইংরেজিতে লিখল – “মাই ফ্যামিলি, স্মল ফ্যামিলি, ডেইলি টুয়েন্টি লিভ্‌স ফল, লিট্‌ল লিট্‌ল পে, হাউ ম্যানেজ!”

তা আমার যে ইংরেজি কথ্য ভাষাতেই সমস্যা সেদিন বুঝলাম, যেদিন আমার ঊর্ধ্বতন অফিসারটি আমাকে জানালেন, “বেঙ্গলীস আর ভেরি গুড ইন ইংলিশ, বাট হোয়েন দে স্পিক – ইট সিম্‌স, দে হ্যাভ রসগুল্লাস ইন দেয়ার মাউথ।”

ধীরে ধীরে বুঝলাম, শুধু বাঙালি নয়, ‘বাংরেজি’ জাতীয় সমস্যা সব প্রদেশের লোকেরই আছে, খামোকা ভেবে মরি আমরা বাঙালিরা। গুরুত্বপূর্ণ মিটিঙে এমনই পাঞ্জাব পুত্তরকে দেখেছি – গলার শির ফুলিয়ে, দাঁত ভেঙে – বৃথা চেষ্টা করে চলেছে আংরেজির তৃষ্ণা মিটাবারে। তার ব্যর্থ প্রচেষ্টা দেখে আমার বঙ্গ হৃদয় বলে উঠেছিল – “মাতৃভাষা রুপখনি, পূর্ণমনিজালে…।”

তা সবে অবোধ সেই পাঞ্জাবি পুত্তর হাল ছাড়েনি, বেহাল হলেও। বেচারা জানতেও পারেনি, অমন ইংরেজির চাইতে পঞ্চনদের ভাষা অনেক বেশি সহজবোধ্য হত আমাদের।

আমার বাংরেজির আর এক পরীক্ষার দিন এল আরও ক’বছর পর। আমাদের গৃহ সহায়িকা তার দেশের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আগে নিজের বিকল্পে একটি দক্ষিণী কন্যাকে দিয়ে গেলেন আমাদের সহায়তার জন্য।

গিন্নি তার স্কুলে গেছেন, আমি ঘর সামলাচ্ছি। গৃহকর্ম সহায়িকা দেখি ইশারায় কী যেন বলে চলেছেন। বুঝলাম, তিনি মূক বা বধির, অথবা দুইই। আমিও ইশারায়…কিন্তু একে গিন্নি বাড়ি নেই, আমি একা, কন্যার বয়স সুবিধাজনক নয় – এই সব ভেবে ইশারায় কাজ চালানো খুব সঙ্গিন মনে হল না।

অফিস থেকে ফিরে গিন্নিকে বললাম, “কোথা থেকে কাজের লোক জোগাড় কর কে জানে? মেয়েটা তো বোবা!”
গিন্নি হেসেই খুন, “আরে ও সবে চেন্নাই থেকে এসেছে, এখনো হিন্দি শেখেনি। তবে ইংরেজিটা দারুণ বলে।”
গৃহ সহায়িকা ইংরেজিতে কথা বলছে, ভাবা যায়? আচ্ছা, ভাবা যাবে নাই বা কেন? লন্ডন আমেরিকায় সহায়কেরা ইংরেজিতেই তো কথা বলে!

পরদিন দখিনী কন্যে কাজে এলেন। এসেই আমাকে ইশারায় যা বলতে চাইলেন, তার মানে হচ্ছে – ঝাঁটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধুর ছাই, ঝাঁটার ইংরেজি যেন কী…মনে পড়েছে, ‘ব্রুম’। খাটের তলা থেকে ঝাঁটা বার করে বলি, “হিয়ার ইস দ্য ব্রুম।”
এবার তিনি ঘর মুছবেন। ন্যাতার ইংরেজি যেন কী…মনের তলায় সাবমেরিন নামিয়ে বার করে আনলাম, ‘মপ’। ভয়ে ভয়ে বলি, “হিয়ার ইস দ্য মপ ম্যাম…”। আঙুল কামড়াই – করেছি কী? কাজের মেয়েকে কেউ ম্যাম বলে। কী জানি, বিদেশেও বলে বোধহয়।
ও বুঝতে পেরে বলে, “বি কমফোর্টেবল স্যার। আই উইল ম্যানেজ।”

এইভাবে আমাদের বাংরেজি ও কন্যের ইংরেজি দিয়ে ঘরের কাজ চলতে থাকে। হপ্তা দুয়েক ইংরেজি বলা সহায়িকা বিকল্পে কাজ করেছিল। নিয়মিত সহায়িকা ফিরে এলে একদিন তাকে আমরা সবাই ভুলে গেলাম। শোনা যায়, মেয়েটি নাকি পড়াশুনোয় ভাল ছিল। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লোকের বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ নিতে হয়। বড় ব্যথা পেয়েছিলাম।

আমার বাংরেজি নিয়েও ট্যাক্স পেয়ারের পয়সায় আমি দিব্যি করে কম্মে খাচ্ছি, আর ভাল ইংরেজি বলেও মেয়েটিকে পরের বাড়ি বাসন মেজে পেট চালাতে হয়। ঠিকানা জানা না থাকায় তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজধানীর বিপুল জন সংখ্যার ভিড়ে সে হারিয়ে গিয়েছিল।