হেরে গেলেন হারুদা

হারুদা গতমাসে রিট্যায়ার করলেন। হারুদা নামে হারু হলেও হারতে শেখেন নি কোনোদিন। চিরকাল শেষ বাজিটা চিত করে দিয়ে উনিই জয়ের হাসি হেসেছেন। ছিলেন সরকারি আমলা। বেশ হোমরা চোমড়া গোছের। বাঘে গরুতে একসাথে জল খাওয়া অনেকদিন শেষ। স্বাধীনতার সত্তর বছর কেটে গেছে, তাই আমলাদের প্রতিপত্তি একটু ঘাটতির দিকে। কিন্তু হারুদা নিজেকে সরকারি যন্ত্রের এক অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বলে মনে করতেন। যন্ত্রাংশের মন থাকতে নেই। যন্ত্রপরিচালকের হাতে যেমন যন্ত্র চালিত হয়, তেমনি যন্ত্রাংশ চালিত হয় যন্ত্রের ইচ্ছেয়। তাই সরকারি যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হয়ে তেত্রিশ বছর কাটিয়ে গলায় গাঁদা ফুলের মালা ঝুলিয়ে রিট্যায়ার করলেন হারুদা।

হারুদার পোশাকি নাম শ্রী হারীন্দ্র লাল গুঁই। আড়ালে তাকে অধস্তনরা হালাগু বলে ডাকত। মঙ্গোল বংশধর অত্যাচারী হালাগু খানের সাথে হারুদার আদেশে ও আচরণের কিছু কিছু মিল হয়ত থেকে থাকতে পারে।

গুরুপদে আসীন এই মানুষটি দম ফেলবার সময় পেতেন না। বাড়িতে একদণ্ড সময় দিতে পারতেন না। তাকে বাড়িতে দেখলেও মনে হতো যেন তিনি অফিসে বিরাজমান। মুখ তুলে আকাশ দেখার সময় পাননি, ঘাড় গুঁজে চিরকাল কাজ করে গেছেন। বিয়ের পর প্রথম দু চার সপ্তাহ বাদ দিয়ে সদা ব্যাতিব্যস্ত স্বল্পভাষী কর্ম পাগল মানুষ। তবে এই দীর্ঘ কর্মজীবনে কখন যে দুটি ছেলে মেয়ে হয়েছে, তারা পড়াশুনো করে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে, হারুদার মনে নেই, থাকবার কথাও নয়। তিনি যে অতি দরকারি, এক সরকারি আমলা!

রিট্যায়ার করবার আগের দিন সহকর্মীরা জানায়, বউকে ফেয়ারওয়েলের দিন নিয়ে আসা নাকি প্রোটোকলের মধ্যে পড়ে। প্রোটকল বলে কথা। সরকারি আমলা প্রোটোকলে জব্দ। হারুদা বউকে বলে রাখলেন আগে ভাগে। এদিকে কতদিন একসাথে কোথাও বাইরে বেরিয়েছেন মনেও পড়েনা। বরের রিট্যারামেন্টের কথা মনে ছিল ঠিকই হারু বউদির। তবে তিনি সাংসারিক নানাবিধ কাজে ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন নি। তেমন করে তিনি আর মানুষটার সঙ্গ পেলেন কই! শনি রবিবার হলেও তকমা এঁটে হারুদা চলত অফিসে। একবারও এল টি সি না নিয়ে রেকর্ড করে সরকারের কত টাকা বাচিয়ে দিয়েছে সে নিয়ে সহকর্মীদের কাছে গর্ব করেছে হারুদা। বউদিও কোনোদিন অনুযোগ করেন নি। অনুযোগ অভিযোগ শোনবার মতো সময় কোথায় ছিল হারুদার? সারাজীবন ধরে শুধু ছুট আর ছুট!

গাঁদা ফুলের মালা বুকে ঝুলিয়ে, ঢাউস সুটকেস উপহার নিয়ে, বউয়ের পাশে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ফটো তুলে (হারুদাকে কেউ কোনোদিন হাসতে দেখেনি অফিসে), অফিসের গাড়িতে শেষ বারের মতো চড়ে, বাড়ি ফিরে এলেন হারুদা। মন উদাস। হবারই কথা। তেত্রিশ বছরের কর্মব্যস্ত জীবন। ফেরার সময় বউদিকে আদালতে রায় শোনাবার মতো করে জানালেন, “কাল থেকে আর অফিস নয়। শুধু তুমি আর আমি। দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে গেলাম বুঝলে।“ বউদির নীরব। জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে চলমান রাস্তা দেখতে থাকলেন।

পরদিন সকালবেলা। মুক্তির প্রথম দিন। হারুদার জীবনে তাড়া নেই। সব তাড়াহুড়ো আজ থেকে শেষ। অন্তত হারুদা তেমনটাই ভাবলেন। বালিশে মুখ গুঁজে, ঘাপটি মেরে পড়ে  আছেন। অভ্যেস যাবে কোথায়? সকাল ছটায় নিয়মমাফিক ওঠার অভ্যেস তো আর একদিনে যাবার নয়। বসার ঘর থেকে মিউজিক সিস্টেমে গান ভেসে আসছে – “তোমায় নতুন করে পাবো বলে, হারাই ক্ষনে ক্ষন, আমার ভালবাসার ধন, তোমায় নতুন করে পাবো বলে……।“

গানের ফল হল, হারুদা আচমকা প্রেম জ্বরে আক্রান্ত হলেন, জীবনে বোধহয় প্রথম। বউদি কি কাজে ঘরে এসেছিলেন কে জানে, হারুদা তার হাত ধরে মারলেন এক পেল্লায় টান। বউদি চমকে উঠলেন, কিন্তু সাময়িক। গোমড়া মুখে ঘর গোছাতে লাগলেন।

হারুদা বললেন, “এবার তুমি আর আমি…।“

  • কি তুমি আর আমি?
  • এবার শুধু ঘুরে বেড়াবো। তুমি আর আমি। আহা, মুক্তি…শান্তি, আহা।
  • হ্যাঁ আমারও মুক্তি। অফিসের ভাত বাড়তে হবেনা। রাতে তোমার ফিরতে দেরী হলে ঠাণ্ডা খাবার নিয়ে বসে থাকতে হবেনা…।
  • ঠিক, বড্ড জ্বালিয়েছি গো তোমাকে…এবার থেকে আর না।

হারুদার মুখে যেন আজ কথার খই ফুটেছে। বউদির প্রতি প্রেম উথলে উঠেছে।

  • এই গানটা কি আমার জন্য চালিয়েছ আজ?
  • কোন গানটা?
  • ওই যে, তোমায় নতুন করে পাবো বলে…আজ আমিও যেন কেমন তোমায় নতুন করে পাচ্ছি জানো?
  • ধুর, তোমার জন্য চালাবো কেন? আমি তো রোজই এ সময় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি চালিয়ে কাজ কম্ম করি। এ আর নতুন কি? বাড়ি থাকলে তো জানতে পারতে।

বউদির ধারালো জবাবে হারুদা কুপোকাত। বেজার মুখে বলে, “চলো না কোথাও ঘুরে আসি!”

  • যাব, ছেলেমেয়ে দুটো দুজনেই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছে অনেকদিন হল। কালই তিন্নি ফ্লাইটের টিকিট পাঠিয়েছে মেইলে। আমি সামনের সপ্তাহে তিন্নি আর গাব্বুর কাছে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে যাব। আর হ্যাঁ, ওরা শুধু আমার টিকিট পাঠিয়েছে। লিখেছে, বাবা ব্যস্ত থাকে, ছুটি পাবেনা…।
  • সেকি, আমি একা একা এখানে…।
  • তুমি আমায় এবার মুক্তি দাও। স্বাধীন হয়ে নিজের মতো জীবনটা কাটিয়ে দেখি না কদিন। আর তোমার পোস্ট রিটায়ারমেন্ট এস্যাইনমেন্টের কি হল?

কিছুক্ষণ নিরব থেকে হারুদা সরব হলেন, ‘ভাবছিলাম নেবো না। আমিও কিন্তু ভেবেছিলাম – তোমায় নতুন করে পাবো…।“

বউদি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘আমিও ভেবেছিলাম গো, ছাব্বিশ বছর আগে। তুমি বরং এনজীও খুলে ফেল। দেখ, নতুন করে কাউকে পাও কিনা।

নির্ভরযোগ্য সুত্রের খবর, হারুদা এখন বিনোদিনী মায়ের আশ্রমে পাকাপাকি ঠাই নিয়েছে। নতুন করে কাউকে পেয়েছেন কিনা এখনো জানা যায়নি। আর বউদি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় দুই ছেলে মেয়ের সাথে দিব্যি জীবন কাটাচ্ছেন। খুব শিগগির আসবেন বলে মনে হয়না।