আমার শহর দিল্লী- ১

img_20161023_113637

‘হট বঙ্গালি বুড়িয়া!  ক্যা সোচা, বংলা মে গালি দেগি অর কুছ সমঝ না আয়েগা? বংলা হমে ভি আতা হ্যায়……’।

ফেরতা দিয়ে শাড়ি পরা মহিলা, যাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল আধবয়সী লোকটা, তার আঁচল তখন মাটিতে লুটোচ্ছে। সে ছিটকে উঠে পালাতে পালাতে বলে উঠল, ‘উঁহহহহহহ, ভাতার আমার, মিনসের ঢঙ দেখ যেন………’।

বাংলার মাঠ ঘাট ডিঙিয়ে, রাজধানীর মহাজনপথে, বাজারে, হোক না ভদ্রজনে অশ্রাব্য। তবু, আহা, কি শুনলাম, এ যেন ‘আমার প্রানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল রে!’ আঃ, কতদিন পরে।

মিলন মুখোপাধ্যায় দেশ পত্রিকাতে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন –‘মুখ চাই মুখ’। তার মুখ্য চরিত্র, ছবি আঁকিয়ে, প্যারিসের রাস্তায় দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি এঁকে লিখে দিত – ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি , তাই পৃথিবীর রুপ খুঁজিতে যাই না আর…’। আর আমি ভরা দুপুরে বাংলার এ কোন মুখ দেখিলাম!

দাঁড়িয়ে পড়লাম। সত্যি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা শুনলাম, দেখলাম। দুটি প্রায় সমবয়সী নারী পুরুষ, চুলো চুলি হাতাহাতি নয়, শুধু মুখের তুবড়ি সম্বল করে লড়ে গেল !  আর আমি, নিজেকে একমাত্র বাঙালি শ্রোতা ভেবে মজা দেখছি। হটাত দেখি জিন্স-টপ -কলেজ- পড়ুয়া দুই তরুণী আলুথালু মহিলার কথা শুনে, হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ল। সর্বনাশ, এরা বাঙালি না হয়ে পারে না। এবার আমার লজ্জা পাবার পালা। এই বয়সে অন্ততঃ দুটি বাচ্চার মেয়ের সামনে……, তাই পিঠ টান দিতেই হল।

কিছু বই খাতা পেন কিনে ফিরে আসছি। দেখি আধঘরে পুরুষটি কাগজের প্লেট হাতে নিয়ে উবু হয়ে বসে চাউমিন খাচ্ছে। একটু দূর থেকে নারীটি সতৃষ্ণ চোখে তাই গিলছে, হয়তো অভুক্ত পেট! এতক্ষনে বোঝা গেল বিরোধের কারণ। চাউমিনের দোকান থেকে একটি মাত্র প্লেট জুটেছিল খাবার জন্য। সেই নিয়ে কাড়াকাড়ি। পুরুষটি মুখ তুলে আমার দিকে চোখ পড়তে হাসবার চেষ্টা করল। উনি আমার পূর্বপরিচিত। একসময়ে সমাজ তত্ত্বের উপর গবেষণা করতেন। কেউ তার থিসিস চুরি করে জমা দিয়ে ডক্টরেট পেয়ে যায়। তারপর থেকে দেখা দেয় মাথার গোলমাল। বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীদের গবেষণার কাজে সাহায্য করে কিছু রোজগার পাতি করেন (যখন তিনি সুস্থ থাকেন)। সদাশয় এক ব্যক্তি তাকে থাকবার একটা জায়গাও দিয়েছেন। ক্ষুরধার বুদ্ধি সম্পন্ন এই ভদ্র মানুষটির সমস্ত চিন্তাজগত জুড়ে শুধু দেশ ও সমাজ। মাঝে মধ্যে মস্তিষ্কে যখন আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তখন তিনি দেশ ও সমাজ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। কিছুটা অসংলগ্ন হলেও তার কথার সারবত্তা বুঝতে পারা যায়। তাই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা সসম্ভ্রমে তার কথা শোনে। কখনো দেখি ঝোলা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বিপর্যস্ত শরীর টেনে টেনে চলেছেন, মুখে চিন্তার ছাপ।

এ মানুষটিকে কি বলবেন, উন্মাদ? নাকি উন্মাদ আমরাই, যারা বাঁধাগতের জীবন যাপন করে চলেছি, স্রেফ চলতে হয় তাই! উপরের ওনার নিজহাতে  লেখা পোস্টার বোধহয় কিছু বলতে চাইছে।