আনাড়ি পাঠক এবং দিল্লী বইমেলা

সরকারী চাকরি করতে গিয়ে কলমের ধার গেছে ভোঁতা হয়ে। তাই লেখকের থেকে পাঠক হওয়াটাই বেশী নিরাপদ মনে হওয়ায়, গত বছর দিল্লী বইমেলায় দুপুর বেলা যখন পৌঁছলাম, তখন বই ক্রেতার চাইতে, বই বিক্রেতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা পরিচিত ছিলেন, তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করে যে গুটিকতক স্টল ছিল, সেদিকে এগোলাম। লেখক বন্ধুর সদ্য প্রকাশিত বই কিনব। প্রকাশকের স্টলে হাজির হলাম। স্টল সামলাচ্ছিলেন যে বুদ্ধিদীপ্ত যুবকটি, তিনি তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যাবস্থাপনায় অতি ব্যস্ত। ক্রেতা দেখতে পেয়ে ছুটে এলেন। অভ্যর্থনাও করলেন। জানালাম, আমি আমার বন্ধুর সদ্যপ্রকাশিত বই কিনতে চাই। বইটি বার করেই বললেন, ‘আমারও একটি বই প্রকাশিত হয়েছে’। উলটে পালটে দেখছি। আমার হাত থেকে বইটি কেড়ে নিয়ে প্রথম পাতায় খসখস করে আমার নাম লিখে, নিচে নিজের নাম সই করে দিলেন। ভাবলাম, আমাকে উপহার দিলেন। এমনি তো হবার কথা! শুনেছি বড় বড় সাহিত্যিকেরা নাকি পাঠকের প্রতি প্রসন্ন হলে, এমনটাই করে থাকেন। তরুণ লেখকটি বলে উঠলেন, ‘নিরানব্বই টাকা’। বেজার মুখে একশ টাকা বাড়িয়ে দিলাম। এক টাকা খুচরো ফেরত পেলাম না। দিল্লীতে একটাকা, দু টাকাকে তাচ্ছিল্ল করা হয় জানা আছে। তাই আর দাঁড়ালাম না। মনে পড়ল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রয়্যালটির টাকা চাইতে নাকি লজ্জা পেতেন।

দুটি বই হাতে নিয়ে এগোলাম। দেখি বিভূতিভূষণ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন আর স্টলের মালিক হাতে মোবাইল নিয়ে খেলছেন। বললাম বিভূতিভূষণ রচনাবলী কিনব। মাটি থেকে বিভূতিভূষণকে তুলে এনে সেই শীর্ণকায়া ছেলেটি দুটি খন্ড ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেল  না। বলে, ‘বিক্রি হয়ে গেছে’। রচনাবলীর খন্ড গুলোও আলাদা আলাদা করে বিক্রি হয় সেটা জানা ছিল না। দু খন্ডেই পেট ভরিয়ে ফিরতে হল। ফেরার আগে আমার পুত্রের জন্য বাঁধাই ‘নন্টে ফন্টে’ আর ‘ফেলুদা সমগ্র’ কিনে নিলাম।

পরের স্টলে গিয়ে দেখি বেজায় ভিড়। সেটি একটি লিটল ম্যাগ প্রকাশন। তাদের আবার ফেসবুক গ্রুপও আছে। সাজুগুজু করা সব বয়সী মহিলা পুরুষ। ওরে বাবা, এরা সবাই একই প্রকাশনের লোক! সর্বনাশ, সুদূর কোলকাতা থেকে দল বেঁধে বই বেচতে এসেছে! আমাকে দেখে সবাই হইহই করে উঠল। আমি প্রমাদ গুনলাম। এদের লেখার সাথে আমি পরিচিত। তার মান সম্পর্কে কি আর বলি। সে যাক গে, এসে যখন পড়েছি, নিস্তার নেই। মুখে হাসি ফুটিয়ে স্টলে ঢুকলাম। সবচাইতে সুন্দরীটি আবার আমার গা ঘেঁসে মুখ তুলে আমাকে দেখে যে! ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, তাই স্ব-পত্নী স্বরণম। বলে ‘আমার বই, একটু দেখুন’। কি ছেড়ে কি দেখি! পাশ থেকে একজন দশাসই মধ্যবয়সিনী বায়স কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘বইটা নিলে এর সাথে আর একটা বই পাচ্ছেন, ফ্রী’। পাতা দু একটা উল্টাচ্ছি তখন। ভাবছি বেঁচে ফিরলে হয় আজ! পকেটের বটুয়াটাও একটু নেড়ে দেখলাম ঠিক আছে কি না। ভিড়ে পকেটমার না হয়ে যায়। মুখ তুলে দেখি আরো দু তিন জন। কি করি, কোথায় থাকি, ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম, আজ এত বেলাতে আমিই প্রথম খদ্দের। চাপদাড়ি তরুণ বলে উঠল, ‘এই বইটা আপনার ভাল লাগবে নিশ্চই, এটা আমার লেখা, সাম্প্রতিক যে সব ঘটনা……’। বিপদ কালে বুদ্ধি নাশ যে হয় নি, বুঝলাম সচ্ছন্দে আমার হাতটা যখন পকেট থেকে মোবাইলটা টেনে বার করল। অন্তরাত্মা বলল, ‘চল ধন্নো, আজ তেরা ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়’।

‘একটা ইম্পরট্যান্ট কল এসেছে’, বলে হনহনিয়ে স্টলের বাইরে পা। পিছনে কয়েক জোড়া চোখ, আমার পিঠকে তখন ফালাফালা করছে। সে করুক গে যাক। খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বাইরের চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার করলাম। পাশে একটি স্কুলের বাচ্চা বসে।তার হাত খালি দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বই কেন নি?’ বিরক্তি ভরা জবাব এল,’না’। তার রোদ চশমা পরা মা উত্তর দিলেন, ‘দেখুন না, একটাও ইংরাজি বই রাখে নি এখানে। আমার ছেলে আবার বাংলাটা একেবারে শেখে নি’। বাংলা না শেখানো বাবা মাকে পাশে নিয়ে ভাবলাম, ‘দাও ফিরে সে অরন্য, থুড়ি, দাও ফিরে সেই কলকাতা’, যেখানে একদা প্রেমিকার হাত ধরে এ স্টল ও স্টল করেছি। পকেটে পয়সা বাড়ন্ত ছিল, তাই বইয়ের বিজ্ঞাপনের কাগজ সম্বল করে ফিরেছি। তখন প্রগতি পাবলিশার্স বেঁচে, তাই দুধের সাধ ঘোলে মিটিয়েছি (অনুবাদ গুলো সব ক্ষেত্রে ভাল হত না)।

এবার একটা মাটির ঘট কিনব, আর তাতে রোজ দু এক টাকা ফেলব। আগামী বছর কোলকাতা বইমেলায় যাওয়ার খরচাটা নিশ্চই উঠে যাবে, কি বলেন?