পেটো কথা

চায়ের দোকানে হারুন দার সাথে বসে সবে চায়ের কাপটা মুখে তুলেছি, অমনি দুড়ুম করে বোমা ফাটার শব্দ। হারুন দা চায়ের কাপে চুমুক দিতে মুখ নাবিয়ে থমকে গিয়ে, আবার মুখ ডুবাল। ভুরূ কুঁচকে না তাকিয়ে বলল, ‘ভয় পেলি না কী?’

বললাম ,’না তো! কিন্তু কী হচ্ছে বল তো?’

হারুন দা মুখটা তেতো খাবার মত করে বলল ,’ধুস, এগুলো শুধু ধোঁয়া ছাড়ে। আওয়াজে দম নেই, ভেতরটা ফাঁকা। পেটো বানাতাম আমরা। এরা কিছু জানে না কি! আমাদের বাতকম্মোতে এর চাইতে বেশী শব্দ হত’।

 

হারুন দা সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনীতি করা লোক। আমাদের মধ্যে যারা ষাট বা সত্তরের দশকে জন্মেছে, তারা জানত বাংলার পেটো শিল্পের কথা। পেটো তখন ছিল বাংলার কুটির শিল্প। একদিকে রাজনীতির দালালরা তাদের ক্ষমতা বাড়াবার প্রচেষ্টায় দাঁত আর নখের প্রয়োগ করছে, আর একদিকে বাংলাদেশ থেকে দলে দলে অসহায় উদ্বাস্তু, যেখানে ফাঁকা জমি পাচ্ছে, সেখানেই ‘কলোনি’ বানাচ্ছে। কর্মসংস্থান নেই, আছে বুক জুড়ে হতাশা। তাই তরতাজা যুবকেরা বেছে নিল রেলের ওয়াগান  ভাঙা বা কলোনি জবরদখলের কাজ। কলকারখানা বন্ধ হল। বাবা, কাকা বা দাদাদের কাজ গেল। রাজনৈতিক নেতারা কেউ জেলে, আর কেউ ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত। এক একটা সংসারে দশটা বারোটা খালি পেট,  দু তিনটে বিয়ের যুগ্যি মেয়ে। এলাকা দখল করতে হাতিয়ার হল পেটো। বারুদ ভরে, পেটের ভিতর পেরেক, ভাঙা ব্লেড, কাঁচের টুকরো ভরে দিয়ে পাটের সুতো দিয়ে কষে বাঁধলেই পেটো তৈরি।

 

শিয়ালদা স্টেশন থেকে উত্তর আর দক্ষিনে যে রেললাইন, তার দু দিকে দেখতে দেখতে গড়ে উঠল অজস্র উদ্বাস্তু কলোনি। আর ওয়াগান ব্রেকার, ছিনতাই বাজেদের দাপট উত্তক্ত করে তুলল জনজীবন। তখন মেয়েরা স্কুলে যায় শাড়ি পরে, বিকেলে কিশোরেরা ব্রতচারী করে খেলার মাঠে। আর কিছুই পাওয়ার ছিল না, তাই কোথাও কোথাও ‘সব পেয়েছির আসর’ বসত। তখন রাস্তায় টিউশন থেকে বাড়ি ফেরার সময় একটা ছেলে একটা মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বললে, শহরতলিতে সেটা খবর হত।

 

পেটো বানাতে প্রয়োজন হত দক্ষ হাতের। বাঁধতে গিয়ে ফেটে গিয়ে কারো কারো হাত বা পা উড়েও যেত। তাদের কথা লোকের মুখে মুখে ফিরে রূপকথার মত হয়ে যেত। বিশেষ উপাধির মত তাদের নাম উচ্চারিত ‘হাত কাটা বাপী’, ল্যাংড়া কার্ত্তিক’ ইত্যাদি বলে। রাস্তা দিয়ে তারা চলত বীরের মত। সসম্ভ্রমে মানুষজন তাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। রবিনহুডের গল্প ওদেরও জানা ছিল। শোলে ফিল্ম তখনো তৈরি হয় নি। তাই মায়েরা ‘শো যা বেটা, নেহি তো গব্বর সিং আ জায়েগা’, না বললেও, সন্ধ্যে আটটা বাজলেই শহরতলির রাস্তাগুলো সুনসান হয়ে যেত। রাস্তা গুলো তখন চলে যেত রবিনহুডদের হাতে। মেয়েটা, বাবা বাড়ী ফিরছে না দেখে, গলির শেষপ্রান্ত পর্যন্ত তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ কড়কর করে তুলত। কলেজ পড়ুয়া ছেলেটা সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হলেও বাড়ি না ফিরলে, মা জল স্পর্শ করত না।

 

আমি যে শহরতলিতে মানুষ হয়ে উঠলাম, সেই জায়গাটা রেল স্টেশন থেকে সামান্য দূরেই। স্টেশন পার হয়ে রিক্সা স্ট্যান্ড। তার গা লাগানো কালী মন্দির পেরিয়ে রেলের মাঠ। মাঠ ছাড়ালেই লম্বা রাস্তা। ডান দিকে বাঁক নিতেই ফাঁকা জমি। চারিদেকে গাছ গাছালিতে ঘেরা শান্ত জায়গাটা সাধ্যের মধ্যে পছন্দ হওয়ায় বাবা কিনে ফেলেন। আস্তে আস্তে চারিদিকে একতলা দোতলা বাড়ি উঠতে থাকে ক্রমশঃ। স্টেশন থেকে যাতায়াতের পথটা এক সময় এই পেটো বাজেদের এলাকা হয়ে ওঠে এবং আস্তে আস্তে গা সওয়া হয়ে যায়। পথে আসতে যেতে, কোনও রবীনহুডের দেখা হলে, কখনও কখনও তারা সৌজন্য বিনিময় করত, ‘ভাল আছ? বাবা ভাল আছেন তো?’

ঘাড় নেড়ে জবাব দিয়ে চলে যেতে যেতে নিজেকে ধন্য মনে হত। এই রবীনহুডেরা তাদের জমে ওঠা টাকা দিয়ে পুন্য কিনতে, কারো মেয়ের বিয়ের জোগাড় করে দিত, আবার দোচালা বানিয়ে মাথা গোঁজার জায়গাও করে দিত। কালী পুজো করত মদ খেয়ে ফুর্তি করার জন্য। চাঁদা আদায় করতে কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি যেত। মুখে তাদের রুমাল গোঁজার প্রয়োজন হত না, কারণ এলাকার লোকেরা সবাই তাদের চিনত।

 

এমনই একজন নায়ক ছিল যার নাম ছিল গোলাপ। তার চেহারা গোলাপকেও ম্লান করে দিতে পারত। হটাতই একদিন জানা গেল গোলাপ আমাদের পাড়ার এক সুন্দরীর প্রেমে পড়েছে। প্রেমিকার পাঁচিল টপকে প্রেম চলছিল ভালই। বাধ সাধল প্রেমিকার ভাই ন্যাপাদা। একদিন সকালবেলা বাজার যাবার সময় চায়ের দোকানে গোলাপকে পেয়ে কলার চেপে ধরল। ন্যাপা দাকে সাহস যুগিয়েছিল তার রাজনীতি করা বন্ধুরা। আসল সময়ে তাদের আর খুঁজে পাওয়া গেল না। একদিন সন্ধ্যে বেলা, আমরা কিশোরেরা যখন সবে ফুটবল মাঠ ছেড়েছি, শোনা গেল ন্যাপাদার পেটে গোলাপ আট ইঞ্চি চাকু ঢুকিয়ে দিয়েছে। ন্যাপাদা পেট চেপে রিক্সায় বসে সোজা হাসপাতালে। চাকু চালাবার পর যাতে সামনে আসতে কেউ সাহস না করে, তাই পরের পর পেটো চার্জ করে যেতে থাকে গোলাপের দলবল। সে রাতেই প্রেমিকাকে বগলদাবা করে গোলাপ পগার পার। পেটো বাহিনীর সাথে থানার পুলিশদের যথেষ্ট যোগসাজশ থাকায় কোন কেসই আদালতে ওঠে নি। ন্যাপাদাও বীরের মত হাসপাতাল থেকে বেঁচে ছাড়া পায়।

 

রেল মাঠের পাশ দিয়ে ফিরছি। কাঁধে তখন কলেজের ঝোলা ব্যাগ। অন্যমনস্ক এক বিকেল। হটাত একটা রোগা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল, ‘দাদা একটু দাঁড়িয়ে যান’।

জিজ্ঞেস করলাম ‘কেন?’

– ‘ বলছি শুনুন না। একটু পরে যাবেন’, বলে হাত ধরে টেনে রেলের একটা কোয়ার্টারের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর নিচু হয়ে, মাটিতে পড়ে থাকা একটা ব্যাগ তুলে হা রে রে রে করে ছুটে গেল মাঠের দিকে। দুম করে একটা পেটো পড়ল মাঠের মাঝ বরাবর। সেই রোগা ছেলেটার কি প্রবল দাপট! সেও বাউন্ডারি থেকে ফিল্ডার যেভাবে বল ছোঁড়ে উইকেট লক্ষ করে, সেভাবে ছুঁড়তে লাগল একটার পর একটা। কোনটাই কারো গায়ে লাগল না। মাঠের মাঝে ঘাস পুড়ে গেল, আর কিছু ক্ষত সৃষ্টি হল। এ যেন ভারত – পাকিস্তান সীমান্ত প্রহরার রুটিন গোলাবাজি! কিছুক্ষণ পর সব শান্ত। যে যার নিজের এলাকায় ফিরে গেল। স্টেশন থেকে সওয়ারি নিয়ে প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ তুলে রিক্সার দল ছুটতে লাগল। দোকানের ঝাঁপ গুলো খুলতে লাগল।

 

 

হারুন দা চা খাওয়া শেষ করে পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট বার করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর বলল, ‘শালারা আমার পিঠে এমন ঝেড়েছিল, সে ব্যাথা এত বছর পরেও চড়চড় করে ওঠে’।

অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে পিছন ফিরে শার্টের কোনাটা তুলে পিঠ দেখাল। চমকে উঠলাম, পিঠের উপর বোমা ফেটে যাবার দগদগে পুরনো ক্ষত। শার্ট নাবিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে চলে গেল হারুন দা। আর আমি তার অপস্রিয়মাণ শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

 

আনাড়ি পাঠক এবং দিল্লী বইমেলা

সরকারী চাকরি করতে গিয়ে কলমের ধার গেছে ভোঁতা হয়ে। তাই লেখকের থেকে পাঠক হওয়াটাই বেশী নিরাপদ মনে হওয়ায়, গত বছর দিল্লী বইমেলায় দুপুর বেলা যখন পৌঁছলাম, তখন বই ক্রেতার চাইতে, বই বিক্রেতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা পরিচিত ছিলেন, তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করে যে গুটিকতক স্টল ছিল, সেদিকে এগোলাম। লেখক বন্ধুর সদ্য প্রকাশিত বই কিনব। প্রকাশকের স্টলে হাজির হলাম। স্টল সামলাচ্ছিলেন যে বুদ্ধিদীপ্ত যুবকটি, তিনি তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যাবস্থাপনায় অতি ব্যস্ত। ক্রেতা দেখতে পেয়ে ছুটে এলেন। অভ্যর্থনাও করলেন। জানালাম, আমি আমার বন্ধুর সদ্যপ্রকাশিত বই কিনতে চাই। বইটি বার করেই বললেন, ‘আমারও একটি বই প্রকাশিত হয়েছে’। উলটে পালটে দেখছি। আমার হাত থেকে বইটি কেড়ে নিয়ে প্রথম পাতায় খসখস করে আমার নাম লিখে, নিচে নিজের নাম সই করে দিলেন। ভাবলাম, আমাকে উপহার দিলেন। এমনি তো হবার কথা! শুনেছি বড় বড় সাহিত্যিকেরা নাকি পাঠকের প্রতি প্রসন্ন হলে, এমনটাই করে থাকেন। তরুণ লেখকটি বলে উঠলেন, ‘নিরানব্বই টাকা’। বেজার মুখে একশ টাকা বাড়িয়ে দিলাম। এক টাকা খুচরো ফেরত পেলাম না। দিল্লীতে একটাকা, দু টাকাকে তাচ্ছিল্ল করা হয় জানা আছে। তাই আর দাঁড়ালাম না। মনে পড়ল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রয়্যালটির টাকা চাইতে নাকি লজ্জা পেতেন।

দুটি বই হাতে নিয়ে এগোলাম। দেখি বিভূতিভূষণ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন আর স্টলের মালিক হাতে মোবাইল নিয়ে খেলছেন। বললাম বিভূতিভূষণ রচনাবলী কিনব। মাটি থেকে বিভূতিভূষণকে তুলে এনে সেই শীর্ণকায়া ছেলেটি দুটি খন্ড ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেল  না। বলে, ‘বিক্রি হয়ে গেছে’। রচনাবলীর খন্ড গুলোও আলাদা আলাদা করে বিক্রি হয় সেটা জানা ছিল না। দু খন্ডেই পেট ভরিয়ে ফিরতে হল। ফেরার আগে আমার পুত্রের জন্য বাঁধাই ‘নন্টে ফন্টে’ আর ‘ফেলুদা সমগ্র’ কিনে নিলাম।

পরের স্টলে গিয়ে দেখি বেজায় ভিড়। সেটি একটি লিটল ম্যাগ প্রকাশন। তাদের আবার ফেসবুক গ্রুপও আছে। সাজুগুজু করা সব বয়সী মহিলা পুরুষ। ওরে বাবা, এরা সবাই একই প্রকাশনের লোক! সর্বনাশ, সুদূর কোলকাতা থেকে দল বেঁধে বই বেচতে এসেছে! আমাকে দেখে সবাই হইহই করে উঠল। আমি প্রমাদ গুনলাম। এদের লেখার সাথে আমি পরিচিত। তার মান সম্পর্কে কি আর বলি। সে যাক গে, এসে যখন পড়েছি, নিস্তার নেই। মুখে হাসি ফুটিয়ে স্টলে ঢুকলাম। সবচাইতে সুন্দরীটি আবার আমার গা ঘেঁসে মুখ তুলে আমাকে দেখে যে! ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, তাই স্ব-পত্নী স্বরণম। বলে ‘আমার বই, একটু দেখুন’। কি ছেড়ে কি দেখি! পাশ থেকে একজন দশাসই মধ্যবয়সিনী বায়স কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘বইটা নিলে এর সাথে আর একটা বই পাচ্ছেন, ফ্রী’। পাতা দু একটা উল্টাচ্ছি তখন। ভাবছি বেঁচে ফিরলে হয় আজ! পকেটের বটুয়াটাও একটু নেড়ে দেখলাম ঠিক আছে কি না। ভিড়ে পকেটমার না হয়ে যায়। মুখ তুলে দেখি আরো দু তিন জন। কি করি, কোথায় থাকি, ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম, আজ এত বেলাতে আমিই প্রথম খদ্দের। চাপদাড়ি তরুণ বলে উঠল, ‘এই বইটা আপনার ভাল লাগবে নিশ্চই, এটা আমার লেখা, সাম্প্রতিক যে সব ঘটনা……’। বিপদ কালে বুদ্ধি নাশ যে হয় নি, বুঝলাম সচ্ছন্দে আমার হাতটা যখন পকেট থেকে মোবাইলটা টেনে বার করল। অন্তরাত্মা বলল, ‘চল ধন্নো, আজ তেরা ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়’।

‘একটা ইম্পরট্যান্ট কল এসেছে’, বলে হনহনিয়ে স্টলের বাইরে পা। পিছনে কয়েক জোড়া চোখ, আমার পিঠকে তখন ফালাফালা করছে। সে করুক গে যাক। খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বাইরের চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার করলাম। পাশে একটি স্কুলের বাচ্চা বসে।তার হাত খালি দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বই কেন নি?’ বিরক্তি ভরা জবাব এল,’না’। তার রোদ চশমা পরা মা উত্তর দিলেন, ‘দেখুন না, একটাও ইংরাজি বই রাখে নি এখানে। আমার ছেলে আবার বাংলাটা একেবারে শেখে নি’। বাংলা না শেখানো বাবা মাকে পাশে নিয়ে ভাবলাম, ‘দাও ফিরে সে অরন্য, থুড়ি, দাও ফিরে সেই কলকাতা’, যেখানে একদা প্রেমিকার হাত ধরে এ স্টল ও স্টল করেছি। পকেটে পয়সা বাড়ন্ত ছিল, তাই বইয়ের বিজ্ঞাপনের কাগজ সম্বল করে ফিরেছি। তখন প্রগতি পাবলিশার্স বেঁচে, তাই দুধের সাধ ঘোলে মিটিয়েছি (অনুবাদ গুলো সব ক্ষেত্রে ভাল হত না)।

এবার একটা মাটির ঘট কিনব, আর তাতে রোজ দু এক টাকা ফেলব। আগামী বছর কোলকাতা বইমেলায় যাওয়ার খরচাটা নিশ্চই উঠে যাবে, কি বলেন?