ভুল সবই ভুল………

মানুষ ভুলে যায় কেন, এ নিয়ে মনস্তাত্বিকদের চিন্তার শেষ নেই। আর সত্যিই তো, ঠিক সময়ে মনে পরে না অনেক কিছুই। তখন রাগ হয় কেন মনে পরছে না, বলে। আবার অনেক মানুষ আছে যারা ভুলের সমুদ্রে তলিয়ে থাকতেই ভালবাসে। ওইটেই তার বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।

তারাপদ রায়, যাকে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় আদর করে ডাকতেন ‘টর্পেডো’ বলে, তিনি এমনই একটি হাসির টর্পেডো ছেড়েছিলেন। এক ভদ্রলোক কিছুই মনে রাখতে পারতেন না। এ নিয়ে তার স্ত্রীর বিড়ম্বনার সীমা ছিল না। একদিন সকালে ভদ্রলোককে ঘুমের মধ্যে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। প্রতিবেশীরা মৃত্যুর কারন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে, স্ত্রী বললেন, ‘ যা ভুলো মন ছিল, বোধহয় নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছিল!’

মানুষ যদি ভুলে না যেত তাহলে কী হত? মস্তিষ্কে চাপ পড়ে যা তা একটা ব্যাপার হত। আরও কি কি ঘটতে পারত ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। এটা তো ঠিক যে কিছু সংসারী ব্যাপার স্যাপার, মানে দাম্পত্য কলহের শুভ মুহূর্তে, মেয়েরা সব মনে রেখে, ঠিক সময়ে ঠিক উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে। পুরনো কোন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবৃতি দিয়ে পুরুষটিকে কাবু করে ফেলে। ভাগ্যিস সেই সময় ছেলেদের কিছুই মনে পড়ে না। তাই রক্ষে। নইলে দাম্পত্য কলহ আর বিশ্ব যুদ্ধের মধ্যে কোন তফাত থাকত না।

একটা গল্প পড়েছিলাম, সুত্র মনে নেই। এক অশীতিপর বৃদ্ধ, বাড়িতে অথিতির সামনেই বার বার তার বৃদ্ধা স্ত্রীকে ‘ডার্লিং আমার মাফলারটা দাও তো’, বা ‘ডার্লিং আমার ওষুধের শিশিটা দাও না প্লিস’, ইত্যাদি বলছিলেন। অতিথি বিস্মিত হয়ে বৃদ্ধকে বললেন, ‘বাঃ আপনাদের প্রেম তো দেখার মত। আপনি এই বয়সেও ওনাকে ‘ডার্লিং’ ছাড়া সম্বোধন করেন না।বৃদ্ধ সামান্য হেসে বললেন, ‘আজ প্রায় এক দশক হল আমি আমার স্ত্রীর নাম ভুলে গেছি। সে কথা তো আর ওকে বলা যায় না, তাই ডার্লিং বলে ডাকলে বিপদের সম্ভাবনা কম’।

এ তো গেল শোনা কথা। এবার একটা পরিচিত মানুষের ভুলে যাওয়ার সত্যি ঘটনা বলি। ভদ্রলোক সরকারী চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন সংখ্যাতাত্ত্বিক। পড়াশুনোতে ভাল তো ছিলেনই, কর্ম জীবনে বেশ সুখ্যাতি ছিল। কিন্তু ওই এক দোষ, সব ভুলে যেতেন। আসলে চিন্তাবিদদের এরকমই হয়। তিনি একা থাকতেন একটি বাসা ভাড়া করে। গরমের ছুটিতে বউ এলেন ছেলে পিলে নিয়ে সময় কাটাতে। ভদ্রলোক এক রবিবার সকালে ঠিক করলেন সবাইকে নিয়ে চিড়িয়াখানা যেতে হবে। কর্তা তার স্ত্রীকে বললেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে বাস স্টপে এস, আমি এগোই’। তিনি একটি সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বাস স্টপে এসে আপনমনে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঘণ্টা খানেক কেটে গেল, বউয়ের দেখা নেই। কর্তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। তিনি আরও একটি সিগারেট ধরিয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। বাড়িতে এসে দেখলেন দরজায় তালা ঝুলছে। বেজায় রেগে গিয়ে, দূর ছাই বলে তিনি ঠিক করলেন চিড়িয়াখানায় যাওয়ার কোন মানেই হয় না। তালা খুলে দেখেন, বউ বাচ্চারা হতদ্যম হয়ে ঘরের মধ্যেই বসে। মানে কর্তাটি বউকে বাস স্টপে আসতে বলে, সব ভুলে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে বাড়ির থেকে বেরিয়ে পরেছিলেন। তার পর নিশ্চই ভদ্রমহিলা বাচ্চাদের নিয়ে রেলে চেপে পড়েছিলেন, ছুটি ফুরানোর আগেই।