স্বর্গ মর্ত্য ডিজিটাল ডিভাইড

যে ডিজিটাল ডিভাইড সাম্প্রতিক কালে মনুষ্যকুলকে কুক্ষিগত করেছে, তার ঢেউ ধাক্কা দিয়ে নড়িয়ে দিয়েছে স্বর্গের ভিত। সেখানে টপ, মিডল আর লোয়ার ম্যানেজমেন্টের মধ্যে নেই কোন তাল মিল। মর্ত্যবাসীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে স্বর্গের দেবতাকুল।

ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের হাই লেভেল মিটিঙে ব্রহ্মা মহেশ্বরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আজকাল ডাকলে পাওয়া যায় না, থাকো কোথায়?”

মহেশ্বর তার ঢুলু ঢুলু চোখ তুলে বললেন, “মোবাইল এর ব্যাবস্থা করতে পারেন না! দেখুন তো মনুষ্যকুল সারাক্ষণ এই যন্ত্রে লেগে আছে তো আছেই! থাকত যদি মোবাইল, একটা মিস কল দিলেই দৌড়ে আসতাম। আমরা সেই পুরনো ওয়ারলেস সিস্টেমে পড়ে আছি…”

বিষ্ণু পদ্মাসনে বসেই বলে উঠলেন, ‘সেবকদের পুজোও যথাসময় দেবতাদের কাছে পৌঁছচ্ছে না। কানেকশন কেটে যাচ্ছে। পণ্ডিতদের টিকির এন্টেনা সিগনাল পাঠাতে অক্ষম হয়ে প্রছে।কিছু একটা না করতে পারলে বিপদ আসন্ন প্রভু’।

তৎক্ষণাৎ তলব গেল বিশ্বকর্মার কাছে। কালি ঝুলি মাখা হাত নোংরা ধুতিতে মুছতে মুছতে হাজির বিশ্বকর্মা। ব্রহ্মা রেগে আগুন, “কী কর সারাদিন? মানুষ্য জাতির হাতে হাতে, কি বুড়ো কি ছুড়ো, মোবাইল দেখেছ? তোমার কারখানাতে এর একটা ক্লোনও বানাতে পার না? ঠিক সময়ে যোগাযোগ না রাখতে পেরে স্বর্গের এডমিনিস্ট্রেশন যে যেতে বসেছে সে খবর রাখ?”

বেজার মুখে অপ্রস্তুত বিশ্বকর্মা “যথা আজ্ঞা” বলে চলে গেলে বিষ্ণু প্রস্তাব রাখলেন, “জগত পিতা, শুধু মোবাইল বানানোই যথেষ্ট নয়। ইন্টারনেট বলে একটা ব্যাপার আছে। সেটা না থাকলে কিছুই নেই। মানব জীবনে এখন এটাই আছে, তাতে ফেসবুক বলে আবার আর একটা ব্যাপার, সারাদিন তা নিয়ে লোকে এত মেতে থাকে, যে দু দণ্ড কথা বলার সময় নেই কারো। কথা যা হয়, তা ওই ফেসবুক বা মোবাইলে হোয়াটস এপে…”

এতটা শুনেই নাকি ব্রহ্মার চারটি মাথাই বাঁই বাঁই করে ঘুরতে থাকে। বয়স তো কম হল না! এত কিছু মাথায় নেওয়া বেশ মুশকিল, তা বুঝতে পারলেও, প্রকাশ করে দিলে স্বর্গের উপর আধিপত্ত কমে যাওয়ার ভয় আছে না! ওনার আবার বয়সের ভারে শুধু ডানমুণ্ডুটিই আজাকাল কাজ করে। বাকি তিনটি অনেকদিন যাবত শাট ডাউন।  কাজেই ওনার আচরণ অনেকটা দক্ষিণ পন্থি। বললেন, “এটা বিশ্বকর্মার একার পক্ষে করে ওঠা অসম্ভব, সবাই মিলে কাজ করতে হবে। মানুষ পারলে আমরাই বা কেন পেরে উঠব না!” দিলেন একটা সরকারী সারকুলার জারী করে। উচ্চ, মধ্যম আর নিম্নস্তরীয় দেব দেবীদের সাধারন সভার নির্দেশ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হল।


দেব দেবীদের সাধারণ সভায় বেজায় শোরগোল দেখে ব্রহ্মা তার ভেটো প্রয়োগ করে দিলেন। সভাগার শান্ত হতে বিষয় সংক্ষেপে জানিয়ে কলাকুশলী কার্তিককে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি তো আমাদের সবার মধ্যে বয়সে তরুণ, তুমি কি পারবে স্বর্গকে ডিজিটাল করে তুলতে?”

কার্ত্তিক হোম ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্রের মত মায়ের আড়ালে নিজেকে লুকোতে লুকোতে বলে উঠল, “আমি মানে, মানুষদের মত…   আসলে ওটা আবার আমার সিলেবাসে ছিল না তো…!

ব্রহ্মা বিরক্ত হয়ে  পবন পুত্রকে বললেন, ‘গন্ধমাদনের মত পারনা মানুষের কাছ থেকে ওই সব কি যেন বলে, মোবাইল, কম্পিউটার এসব উঠিয়ে আনতে?’

পবনপুত্র বললেন, ‘ওটা শিখিনি প্রভু।এ যুগে ওটাকে বলে চৌর্যবৃত্তি। ইন্দ্রদেবকে বলে দেখুন না, উনি তো সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর!’

ইন্দ্রদেব তখন সবে সভায় প্রবেশ করছেন। তার বিলম্বে ব্রহ্মা রেগে আগুন। বোর্ড মিটিঙে সি ই ও যেমন ভাবে সদস্যদের জরীপ করে, তেমন ভাবে চেয়ে রইলেন। বরুণ চিমটি কাটতে ছাড়লেন না। চাপা জড়ানো গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজকাল কি সকাল সকালই অপ্সরাদের নাচের ব্যবস্থা করেছ না কি হে!’

ইন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললেন, ‘না হে। রম্ভার দুটো হাঁটুতেই বেজায় ব্যথা। ধন্যন্ত্ররী বলেছে হাঁটু বদলাতে হবে। নকল হাঁটু নিয়ে আর কি নাচতে পারবে? উর্বশীও আজকাল খুব ঝামেলা করছে। নাচতেই চায় না, বলে পারিশ্রমিক বাড়াও। এর চাইতে আই পি এল এ চিয়ার গার্লের কাজে নাকি পারিশ্রমিক অনেক, আর খাটুনিও কম। তাই আমার দরবারে নাচানাচি এখন একেবারে বন্ধ’।

‘কারা কথা কয়?’ ব্রহ্মা চেঁচিয়ে উঠলেন। ইন্দ্র, মহেশ্বর  নীরব হলেন’। ‘ডিজিটাল স্বর্গ’ নিয়ে মীমাংসা অধরাই রয়ে গেল। সভা পণ্ড হতে যাচ্ছে দেখে, দেবী দুর্গা তার একটি হাত উঠিয়ে কিছু বলতে গেলেন, কাজ হল না। পাশ থেকে লক্ষ্মীর কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে দুর্গা দশটি হাত তুলতে ব্রহ্মার নজর পড়তে বললেন, ‘প্রভু, আমার মর্তের ট্যুর প্রোগ্রামে আপনার সই হয় নি’।

ব্রহ্মা বললেন, ‘আজকের সভা তো স্বর্গকে ডিজিটাল করবার জন্য  ডাকা হয়েছে। ট্যুর আসছে কোথা থেকে?’

‘ পুজো আসন্ন প্রভু’।

‘সুত্রের খবর অনুযায়ী তোমার ভক্তরা পুজোতে যত না মনযোগী, তার চাইতে বেশি সেলফিতে। পুরহিতেরাও নাকি পুজো করতে করতে হয়াটস এপ করে!’

‘তা হয়ত হবে প্রভু। তবু সই টা করে দিলে একবার ঘুরে আসতাম। অভ্যেস হয়ে গেছে যে বছরে একবার যাবার’ দুর্গা বলেন আক্ষেপ করে।

‘তোমার ছেলে মেয়েরাও হয়ে গেছে সেকেলে। কিছুই পারছে না শিখতে। প্রতি বছরই যায়, কি শেখে? শুনলে তো, তোমার ছেলে কার্ত্তিক কত পিছনে পড়ে আছে! মানুষ ঠেকে শিখছে, আর দেবতারা?’ ব্রহ্মা রেগে ওঠেন।

বীরেশ্বরের জলদগম্ভীর স্বর বেজে উঠল। ব্রহ্মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘প্রভু, দেবতাদের দ্বারা যে কম্ম হচ্ছে না, তা স্বর্গবাসী মানুষদের দিয়ে করানো হোক। বেশ কিছু ট্যালেন্টেড মানুষ স্বর্গোদ্যানে খেলে বেড়াচ্ছে আর বিনে পয়সায় খেয়ে খেয়ে মোটা হচ্ছে। বেঁচে থাকতে যারা বুদ্ধিজীবী ছিল, বুদ্ধির উপর চর্বি জমিয়ে তারা দিব্যি আছে’।

ডাক পড়ল চিত্রগুপ্তের। যাও খাতা আন, রেকর্ড দেখে বল কারা স্বর্গকে ডিজিটাল করতে পারবে। চিত্রগুপ্ত হাঁফাতে হাঁফাতে সভায় প্রবেশ করল, সাথে দশজন খাতা বাহক। ব্রহ্মা পুত্রের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘হে বৎস, খাতা দেখে বল, কোন কোন স্বর্গবাসী মনুষ্য স্বর্গকে ডিজিটাল করবার ক্ষমতা রাখে?’

চিত্রগুপ্তের ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগল। বুঝে নিয়ে উত্তর দিল, ‘হে প্রভু, সমস্ত খাতা দেখে উত্তর দিতে অনেক সময় লাগবে’।

ইন্দ্র ও বরুণ জোরে জোরে হেসে ওঠায় সভা কাঁপতে থাকল। দেবরাজ বলে উঠলেন,’ এখানে রেকর্ড কিপিং খুব খারাপ প্রভু। মানুষ বাড়ছে সংখ্যায়, মরছেও। এখন প্রয়োজন ই রেকর্ড। এ সব চিত্রের কর্ম নয়।‘

ব্রহ্মা হতাশ হন, ‘তা হলে কি মানুষ আমাদের উপর আধিপত্য ফলাবে অদূর ভবিষ্যতে? দেবতাদের সব ক্ষমতা যাবে হারিয়ে!’  ব্রহ্মার তিনটি মাথাই এবার ঝিমঝিম করতে থাকে। শক পেয়ে বাকি দুটো অকেজো মাথাতেও প্রাণ ফিরে আসে। মাথা তিনটি ঘেমে ওঠায়, তিনটি মুকুট এক এক করে খুলে রাখেন টেবিলে। তাঁর মাথার উপর ত্রিকালের ঘড়ি বেজে ওঠে ঢং ঢং শব্দে।