অথ নস্যি কথা

সদর দরজা খুলতেই যাকে দেখা গেল, তার মাথায় সাদা পাকা চুল, কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। চিনতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বললেন,”আসবো?”। বললাম, “আসুন, কিন্তু চিনলাম না আপনাকে”
একপা ঘরের ভিতর এগিয়ে দিয়ে বললেন,”আমি তো চিনি আপনাকে!’
অগত্যা সরে জায়গা করে দিতে দিতে লক্ষ্য করলাম, ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আর তর্জনীর মাঝে ধরা আছে এক টিপ নস্যি। সজোরে নাকের ডান ছিদ্রে প্রবেশ করে নাক টানলেন। জুতো খুলতে খুলতে নস্যির ডিবেটা চালান করে দিলেন পকেটে।নস্যির গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ল, নাক সুরসুর করে উঠল।
অনেকদিন পর কাউকে নস্যির নেশা করতে দেখলাম। কয়েক দশক এই গুঁড়ো তামাকের নেশা কাউকে করতে দেখি নি। নস্যির নেশা কি বিলুপ্তির পথে? যে কোন নেশাই অবশ্য বিলুপ্ত হলেই মানুষের মঙ্গল!

স্কুল জীবনে একবার অঙ্কে কম নম্বর পাওয়ায় আমার জন্য একজন মাস্টারমশাই রাখা হল। তিনি পড়াতে আসতেন প্রায় মাঝরাতে, মানে আমার মত তখনকার এক বাচ্চার পক্ষে তো বটেই! তা মাস্টারমশাই সারাদিনের ছাত্রভাঙা খাটুনির পর নিজেকে জাগিয়ে রাখতেই বোধহয়, ঘনঘন নস্যি টানতেন। সেই থেকেই নস্যির উপর বিরক্তি জন্মায়। একে অঙ্ক, তায় খিদের পেট, নস্যির ঝাঁঝালো গন্ধ! নস্যি যারা নেয় তারা ‘ন’ কে বলেন ‘ল’, কারন সর্বক্ষণের সর্দিতে বন্ধ নাকে এই সুরই বেরনোর কথা। মানে ‘নস্যি’ কে বলেন ‘লস্যি’। কিন্তু কোথায় নস্যি আর কোথায় গরমের দিনের লস্যি!সে যাই হোক, আমাকে ঢুলুঢুলু চোখে ‘ভগ্লাংস’এর অঙ্ক করতে হত। একদিন অঙ্ক খাতার পাতায় বেশ খানিকটা নস্যি পরে যায়। মাস্টারমশাই সেদিনের মত পাততাড়ি গুটাতেই খাতায় পড়ে থাকা নস্যি দুই আঙুলে তুলে দিলাম নাকের ভিতরে এক টান। আর যায় কোথা! হ্যাঁচ্চো, হাঁচ্চো, …..চোখ লাল। সবাই ভাবল ঠাণ্ডা লাগল বুঝি। বেজায় হাসি পেল। গান টান ছোটবেলা থেকেই একটু আধটু শুনতাম। মনে পড়ে গেল, ‘হ্যাঁচ্চো, হাঁচ্চো ওওওওওওও, ভয় কি দেখাচ্ছ, হ্যাঁচ্চো’। হাঁচি পেলেও তো সেই রবীন্দ্রনাথ ভরসা!

“সিং নেই তবু নাম তার সিংহ ……” গেয়ে গেলেন কিশোর কুমার। “নাও তার পর একটিপ নস্যি, তার পর খাও এক মগ লস্যি……”

সুকুমার রায় লিখে গেলেন-

“সিংহাসনে বস্‌ল রাজা বাজল কাঁসর ঘন্টা,

ছট্ফটিয়ে উঠল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর থেকেই
বললে রাজা, “মন্ত্রী, তোমার জামায় কেন গন্ধ?”
মন্ত্রী বলে, “এসেন্স দিছি- গন্ধ ত নয় মন্দ!”
রাজা বলেন, “মন্দ ভালো দেখুক শুঁকে বদ্যি,”
বদ্যি বলে, “আমার নাকে বেজায় হল সর্দি।”
রাজা হাঁকেন , “বোলাও তবে- রাম নারায়ণ পাত্র।”
পাত্র বলে, “নস্যি নিলাম এক্ষনি এইমাত্র-
নস্যি দিয়ে বন্ধ যে নাক, গন্ধ কোথায় ঢুকবে?”

গন্ধ বিচারে পাত্তা না পেলেও এক সময় এ ছিল বড়লোকের নেশা। সপ্তদশ শতকে জন্ম। সর্বপ্রথম সম্ভবতঃ ফ্রান্সে এর উদ্ভব। তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ, আমেরিকাতেও। বড়লোকের নেশা বলে ট্যাক্স বসাতে শুরু করলেন ইংল্যান্ডের অধীশ্বরেরা। নস্যির কত রকমফের, কত প্রস্তুতি পদ্ধতি! নানা বর্ণে, নানা গন্ধে নব রুপে এল। ব্যাবসায়ীদের পকেট ভরল, রাজকোষ উপচে পড়ল। বিরক্তির উদ্রেকও কম করল না ভদ্রসমাজে। ভাবা যায়! যেখানে সেখানে এক টিপ নস্যি নিচ্ছে লোকে, কাপড় নোংরা হচ্ছে, নাক ঝাড়ছে। কাজেই উচ্চবিত্ত সমাজে ক্রমশ জনপ্রিয়তা হারাল। সাধারনের নেশায় পরিণত হল। রাশিয়তে জার রেগে গিয়ে ডিক্রি জারি করল, নস্যি নিলে নাক কেটে দেওয়া হবে। কি ভয়ানক! নাকের বদলে নিশ্চই কর্তিত নাকের মালিককে নরুন দেওয়া হত না।

আমার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ভদ্রলোক নাক ঝাড়লেন, ‘প্যাঁ ……।” শব্দ করে।
বললাম, “আবার আসবেল”।
বললেন, “লিশ্চই”।